বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই বছরে বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি বাবদ বিপুল অংকের অর্থ বকেয়া পড়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হয়। চলতি ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে কয়েক ধাপে বিশেষ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি বাবদ ২৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। ভর্তুকি বাবদ বকেয়া থেকে যাওয়া বাকি দায় পরিশোধের ভার এখন গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন দায় পরিশোধের চাপও। এ অবস্থায় বিগত সরকারের মতো বকেয়া পরিশোধে বন্ডের দ্বারস্থ হয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের চাপ আপাতভাবে সামাল দেয়া গেলেও এর মাধ্যমে মূলত বর্তমান দায়কে বিলম্বিত করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎ ঋণের বোঝা আরো বড় হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত বন্ডের পরিবর্তে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে নিজস্ব অর্থে এ দায় পরিশোধ করার মতো টেকসই সমাধানের দিকে নজর দেয়া।
সরকারি দায় পরিশোধে বন্ড ইস্যুর নজির বেশ পুরনো। তবে এর চর্চা অতীতে খুব বেশি দেখা যায়নি। বেশ আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দায় পরিশোধের জন্য বিশেষ বন্ড ইস্যু করেছিল সরকার। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বড় অংকের দায় পরিশোধের নজির দেখা যায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষ দিকে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকির দায় পরিশোধে ২৬ হাজার ২০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করে আওয়ামী লীগ সরকার। এর মধ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বন্ড ইস্যু করা হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির দায় পরিশোধে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ১২ হাজার কোটি টাকার মতো বিশেষ বন্ড ইস্যু করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ খাতে এবং সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা সারের ভর্তুকি পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়েছে। তাছাড়া এ সময়ে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ বাজেট বরাদ্দ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে।
ভর্তুকির বিপরীতে ইস্যু করা বিশেষ বন্ডের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ থেকে ১০ বছর। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইস্যু করা বন্ডের ক্ষেত্রে এ মেয়াদ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ-ছয় বছর। সরকারকে নির্ধারিত সময় শেষে বন্ডের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এর আগ পর্যন্ত যেসব ব্যাংকের অনুকূলে এসব বন্ড ইস্যু করা হয়েছে তাদের সুদ পরিশোধ করবে সরকার। এক্ষেত্রে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার বা রেপো অনুসারে। বর্তমানে এ হার ১০ শতাংশ। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ব্যাংকের কাছে থাকা বিদ্যুৎ ও সার কোম্পানিগুলোর দায় পরিশোধ করে দিচ্ছে সরকার। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বিদ্যমান বাজারদরের চেয়ে কম সুদে এসব বন্ড নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে তারল্য সুবিধা নিচ্ছে। ফলে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হচ্ছে। বিগত সরকারের সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক সরকারকে তারল্য সরবরাহ করার কারণে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি আরো সঙ্গিন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে সহায়তা করার চর্চা বাদ দিয়েছে। এর পরিবর্তে নীতি সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে আরো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার। এ অবস্থায় ভর্তুকির বিপরীতে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বাজারে সৃষ্ট অতিরিক্ত তারল্য তুলে নেয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নতুন করে বাংলাদেশ ব্যাংক বিল চালু করেছি। ফলে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে যে পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হবে সেটি বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হবে। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়টি পিছিয়ে দেয়ার কারণে ঋণ কিছুটা বাড়বে। তবে এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ আমাদের ঋণ নিরাপদ সীমার মধ্যেই রয়েছে। সরকার রাজস্ব আয় বৃদ্ধির দিকে এরই মধ্যে নজর দিয়েছে। টেকসই উপায়ে বকেয়া পরিশোধ করতে হলে রাজস্ব আয় বাড়াতেই হবে।’
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণে কিছুটা প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) মোট ১ লাখ ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করেছে সংস্থাটি। এর আগে গত অর্থবছরের (২০২৩-২৪) একই সময়সীমায় রাজস্ব আহরণ হয়েছিল ৯৩ হাজার ২৪২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকেও ভর্তুকির অর্থ পরিশোধে বন্ড ছাড়ার পরিবর্তে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ রয়েছে। চলতি বছরের জুনে ঋণের তৃতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশ সফর করে যায়। সংস্থাটির মিশন শেষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভর্তুকির বকেয়া পরিশোধের জন্য সরকারের ইস্যু করা বিশেষ বন্ডের বিষয়টি উঠে আসে। সে সময় আইএমএফের পক্ষ থেকে বাজারের চেয়ে কম সুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ"ও সার কোম্পানিগুলোর ভর্তুকির বকেয়া অর্থ পরিশোধ বন্ধের কথা বলা হয়। বাংলাদেশও সে সময় সংস্থাটিকে নতুন করে বকেয়া পুঞ্জীভূত না করার পাশাপাশি বিদ্যমান বকেয়া পাঁচ বছরের মধ্যে বাজেট থেকে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, গত জুন শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ২ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকায়। এর আগের বছরের জুন শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৭ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। গত জুলাই শেষে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে ৯ লাখ ২৫ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিপিডিবির তথ্যানুসারে, গত অক্টোবর শেষে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে চলতি অর্থবছর থেকেই বকেয়া সমন্বয়ের কাজ শুরু হবে। তবে বিদ্যমান বাস্তবতায় চলতি অর্থবছরেও কিছু পরিমাণ বকেয়া পরিশোধের জন্য বন্ড ইস্যু করতে হবে। তবে সরকার বন্ডের চেয়ে নগদ অর্থে বকেয়া পরিশোধে গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি। আগামী মাসে আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশে আসছে। এ মিশনের আলোচনার সময় সরকারের বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। আইএমএফের কর্মকর্তারা আলোচনায় বিশেষ বন্ড ইস্যুর বিষয়টি অবশ্যই তুলবেন। যদি তারা পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্ড ইস্যুর বিষয়টিকে নমনীয়ভাবে দেখেন তাহলে সামনে আরো বন্ড ইস্যু হতে পারে। তবে আইএমএফ যদি বন্ড ইস্যু না করার বিষয়ে কঠোর হয় তাহলে বিকল্প চিন্তা করতে হবে।
পাকিস্তানে ২০১৩ সালেও বিদ্যুৎ খাতের সার্কুলার ডেট বা চক্রাকার ঋণ ছিল ৪৫ হাজার কোটি রুপি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যেই তা কয়েক গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি রুপিতে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে দেশটির সার্কুলার ডেট দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ কোটি রুপিতে। বিদ্যুৎ খাতের এ সার্কুলার ডেটকেই এখন দেশটির সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর অন্যতম হিসেবে দেখা হচ্ছে। চক্রাকার এ ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে দেশটির সরকার রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) কমানো, ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি, আইপিপিগুলোর স্থানীয় ইকুইটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ডলারে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ বাতিল করা, দেরিতে পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে জরিমানা ও সুদ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি পুরনো বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো বন্ধ করে দেয়া এবং নতুন কোম্পানিগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া, মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেয়াদ আর না বাড়ানো, আমদানি করা জ্বালানি তেল কেনার চুক্তি পুনরায় দরকষাকষি করা এবং আর্থিকভাবে টেকসই নয় এমন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থগিতেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে দেশটির চক্রাকার ঋণের বোঝা এত বড় হয়ে উঠেছে যে সেটি সামলানো অনেকটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বকেয়াও সরকারের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে বাতিল কিংবা দরকষাকষি করে পুনরায় চুক্তির মাধ্যমে সরকারের আর্থিক বোঝা লাঘবের উদ্যোগ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে পাকিস্তানের মতো চক্রাকার ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্ড ইস্যু করলে নির্দিষ্ট সময় পর এটি পরিশোধ করতে হবে। এর মাধ্যমে ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর গিয়ে বর্তাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাপের মধ্যে আছে সে হিসেবে বন্ড ইস্যু করা যেতে পারে। কিন্তু এটি যদি নিয়মিত চর্চা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে উদ্বেগের কারণ হবে। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি পরিশোধ করাটা কোনো টেকসই সমাধান নয়। এমনিতেই আমাদের ঋণের বোঝা ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে ঋণ বাড়তে থাকলে একসময় দেখা যাবে যে আমাদের ঋণের ভার এমন পর্যায়ে চলে যাবে যে সেটি পরিশোধ করার ক্ষমতা থাকবে না, এটিও মাথায় রাখতে হবে। তাই এটি পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়। এর পরিবর্তে রাজস্ব বাড়িয়ে দায় পরিশোধের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’